রাজনীতিতে নিজের কঠিন সময়েও অস্তিত্বের জানানি দিলেন তৈমূর!

সান নারায়ণগঞ্জ

নিজের রাজনীতির কঠিন সময়েও নিজের অস্তিত্বের জানানি দিলেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত বিএনপির চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার। বিএনপির চেয়ারপার্সন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করেছেন তৈমূর আলম খন্দকার। প্রায় ৫ হাজারের অধিক নেতাকর্মীদের নিয়ে খালেদা জিয়ার করব জিয়ারত করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন রাজনৈতিক অঙ্গনে।

এখানে উল্লেখ্যযে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতির বাহিরে রয়েছেন বিএনপির এক সময়কার দাপটশালী নেতা ড. তৈমূর আলম খন্দকার। তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন একাধারে দুই যুগের কাছাকাছি সময়। হয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি তৃণমুল বিএনপি নামক দলে মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু নির্বাচনের কয়েক মাসের মাথায় তিনি এই দল থেকেও সরে দাঁড়ান। বর্তমানে তিনি কোনো দলের সঙ্গেই রাজনীতি করছেন না।

বিভিন্ন সূত্রে জানাগেছে, এবারের নির্বাচনেও তিনি বিভিন্ন দল থেকে প্রস্তাব পেলেও কোনোদিকেই যোগদান করেননি এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগ্রহ দেখাননি। এ নিয়ে জাতীয় সহ স্থানীয় গণমাধ্যমে খোলামেলা কথা বলেছেন তৈমুর আলম খন্দকার। তৃণমুল বিএনপিতে কেন যোগদান করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন সেই বিষয়টিও তিনি পরিষ্কার করেছেন গণমাধ্যমে। সেইসব সাক্ষাতকারে তিনি জানিয়েছেন তৃণমুল বিএনপিতে যোগদানের কারন।

গণমাধ্যমে সাক্ষাতকারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘দল আমাকে ১৯৯৮ সালে মহানগর বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব দেয়, টানা দাঁয়িত্ব পালনের পর ২০০৩ সালে জেলা বিএনপির সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই, ১/১১ এর সময় তারেক রহমানের পক্ষে যখন কেউ আইনি লড়াই চালাতে সাহস করেনি, তখন আমি কোর্টে তারেক রহমানের পক্ষে আইনী লড়াই করি, এর চতুর্থ দিনের মাথায় সেনাবাহিনী আমাকে গ্রেপ্তার করে, ২৬ মাস কারাভোগ করেছি।’

‘ওই সময় সেনাবাহিনী আমাকে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা ১৬৪ ধারার জবাববন্দি দিতে চাপ দিয়েছিলো, রিমান্ডে নিয়েছিলো, আমি তাদের বিরুদ্ধে জবাববন্দি দেইনি। ২৬ মাস পর কারাগার থেকে বের হলে ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর জেলা বিএনপির সম্মেলনে আমি সভাপতি নির্বাচিত হই।’

‘২০১১ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা থাকা স্বত্তেও দলের নির্দেশে ভোটের ৭ ঘন্টা আগে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াই, ২০১৬ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দল থেকে আমাকে প্রার্থী করতে চেয়েছিলো আমি নির্বাচন করিনি, যার ফলে ২০১৭ সালে জেলা বিএনপির নতুন কমিটি করা হলো আমাকে বাদ দিয়ে, আড়াই বছর পর ২০২০ সালে আমাকে আবারো দায়িত্ব দেয়া হলো জেলা বিএনপির আহ্বায়ক করে, ২০২২ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় আমাকে বিনা নোটিশে বহিষ্কার করা হলো।’

‘২০২২ সালে সিটি নির্বাচনের পূর্বে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল আলমগীর সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেছিলেন, ‘দলীয়ভাবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেনা বিএনপি। তবে কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার, এতে দল কাউকে বাধা দিবেনা।’

‘তার এই ঘোষণায় আমি ২০২২ সালে প্রার্থী হই, মনোনয়ন সংগ্রহ করি, মনোনয়ন দাখিল করি, মার্কা নিয়ে ভোটে প্রচারনায় নামি, তখন কেন্দ্র থেকে আমাকে কেউ নির্বাচন থেকে সরে যেতে বলেননি, কিন্তু গোপনে গোপনে আমার চারপাশের নেতাদের সরিয়ে দেয় আমার অগোচরে, যখন মহানগর বিএনপির সেক্রেটারি এটিএম কামালকে সরে যেতে বলে তখন সে সরে যায়নি, ফলে এটিএম কামাল ও আমাকে অব্যাহতির দুদিন পর বহিষ্কার করা হলো বিনা নোটিশে।’

‘১৯৯৮ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মাঝের আড়াই বছর বাদে প্রায় ২০ বছর জেলা বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছি আমি, সেই আমি যখন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তখন আমাকে বিনা নোটিশে বহিষ্কার করা হলো। বহিষ্কারের পরেও দুই বছর দলের সকল আন্দোলন সংগ্রাম করেছি, ঢাকার সকল আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছি, কিন্তু আমার নামটাও ঘোষণা হতোনা কর্মসূচিতে, রাস্তায় মাটিতে বসে থাকতাম। একাধিকবার নেতাকর্মীরা আমার বহিষ্কার প্রত্যাহারের দাবিতে কেন্দ্রে দরখাস্ত দিয়েছিলো, কর্মসূচি পালন করে বহিষ্কার প্রত্যাহারের দাবি তুলেছিলো, তবুও আমার বহিষ্কার প্রত্যাহার করা হয়নি। আমি রাজনীতিক, রাজনীতি আমার ধ্যান জ্ঞান।’

‘আমি ১৯৯৮ সাল থেকে দলের সকল আন্দোলন সংগ্রাম করেছি, কখনো ব্যানার ছেড়ে রাজপথ থেকে পালিয়ে যাইনি, রাস্তায় গুলি খেয়েছি, আমার বাড়িঘর ভাংচুর আগুন লাগিয়ে দেয়া হলো, চেম্বার আগুন লাগিয়ে দেয়া হলো, আমার একটা ভাই খুনের শিকার হলো, চাষাড়া বোমা হামলায় ২১ মার্ডার মামলায় আমাকে প্রধান আসামী করা হলো। ২০১৩ সালে জেলে থাকাবস্থায় কেন্দ্রীয় নেতারা যখন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত করতে যান তখন নেত্রী তাদের বলেছিলেন, আমার তৈমূর কই? কেন তাকে বহিষ্কার করলা? তার কি দলে কোনো অবদান নেই? নেত্রী এই কথা বলার পরেও আমার বহিষ্কার প্রত্যাহার করা হলো না।’

‘পরে অনেকটা বাধ্য হয়েই আমার আইন পেশার গুরু ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা স্যারের কথা রক্ষা করতে গিয়ে তৃণমূল বিএনপির হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। নির্বাচনের পরপরই এই দলের সকল কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়িয়েছি। আপাতত রাজনীতি নিয়ে ভাবছিনা। আমি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী, জাতীয়তাবাদেই আছি।’

অন্যদিকে গত ১৭ জানুয়ারী শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি জিয়া উদ্যানে প্রায় ৫ হাজারের অধিক নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রবেশ করেন তৈমূর আলম খন্দকার। এরপর বেলা ১১টার দিকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন ও মোনাজাতে অংশ নেন। এ সময় তিনি প্রয়াত শহীদ রাষ্ট্রপতির রুহের মাগফিরাত কামনাও করেন।

কবর জিয়ারত শেষে তৈমূর আলম সাংবাদিকদের বলেন, “আমি বর্তমানে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হলেও একজন মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতা কখনো শেষ হয়ে যায় না। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি আমার সেই শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা থেকেই আজ এখানে এসেছি। পাশাপাশি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতিও শ্রদ্ধা জানানো আমার নৈতিক দায়িত্ব।”

তিনি আরও বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া যখন সুস্থ ছিলেন, তখন তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কাছে প্রশ্ন করেছিলেন— ‘আমার তৈমূর কোথায়? তাকে কেন বহিষ্কার করা হলো?’ যদি তিনি সত্যিই এমন কথা বলে থাকেন, তাহলে আইনগতভাবেও আমার বহিষ্কার টিকে থাকার কথা নয়। আমি যেখানেই থাকি, যে অবস্থায় থাকি— দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি আমি সবসময় কৃতজ্ঞ থাকব।”

নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি অতীতেও বিএনপি ও জনগণের সঙ্গে ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব। পানি কাটলে দুিই টুকরো হবে, কিন্তু নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হবে না। দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা রয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে আমি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মার্কায় ভোট দেব।”

এর আগে সকালে নারায়ণগঞ্জ থেকে গাড়িবহর নিয়ে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে জিয়া উদ্যানে আসেন তৈমূর আলম খন্দকার। কবর জিয়ারত শেষে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শেষ করেন তিনি।

এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জিয়া উদ্যানে উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনেকেই এ সময় খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা স্মরণ করেন এবং বিএনপির ঐক্য পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানান।