থাকছে না উপজেলা পরিষদ : চেয়ারম্যান হওয়ার স্বপ্ন অধরা

সান নারায়ণগঞ্জ

স্থানীয় সরকার কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ স্তর উপজেলা পরিষদের বিদ্যমান কাঠামোকে ঘিরে দ্বিধায় রয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বর্তমান কাঠামোর আওতায় উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার বিষয়ে তেমন আগ্রহ নেই। বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা ও মন্ত্রীর সঙ্গে আলাপে এই অবস্থানের ইঙ্গিত মিলেছে বলে জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এমন খবরে হতাশায় ভুগছেন সোনারগাঁও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীদের অনুগামীরা।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সোনারগাঁও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতিমধ্যে মাঠে নেমেছিলেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা তুহিন মাহামুদ। জামায়াত ইসলামীও তাদের প্রার্থী হিসেবে আলী আজগরকে নিয়ে পরিকল্পনা শুরু করেছেন। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলেও দল থেকে সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে ঠিকিই থাকবে। সেক্ষেত্রে এখানে বিএনপিকে ঠেকাতে এনসিপি ও জামায়াত ইসলামী একজোট হয়ে নির্বাচনের যাওয়ার প্রস্তুতিও মোটামুটি সেরে ফেলেছিল।

একইভাবে বিএনপির নেতাদের মধ্যে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে লড়ার ঘোষণা দিয়েছেন উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি কাজী নজরুল ইসলাম টিটু। একই পদে নির্বাচনী প্রস্তুতিতে ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান মামুন। নির্বাচনী আলোচনায় আছেন উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজী সেলিম হক রুমী ও উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আল মুজাহিদ মল্লিক। এসব নেতাদের নিয়ে তাদের অনুগামীরা স্বপ্ন দেখছিলেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদের।

সূত্র বলছে, বিএনপির এমন অবস্থান নতুন নয়; ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়ার সরকার এরশাদ আমলে চালু হওয়া উপজেলা পরিষদ বাতিল করেছিল। একই বছরের নভেম্বরে অধ্যাদেশ জারি করে তা বিলুপ্ত করা হয়েছিল। এবার প্রতিটি উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে সংসদ সদস্যদের জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’ তৈরির সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সরকার এটিকে প্রশাসনিক সমন্বয় ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।

১৯৯১ সালের মার্চে ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়ার সরকার উপজেলা পরিষদ বাতিল করে। ওই বছরের নভেম্বরে ‘স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসন পুনর্গঠন) (রদ) অধ্যাদেশ ১৯৯১’ পাস করে উপজেলা পরিষদ বিলোপ করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৮ সালে উপজেলা পরিষদ আইন করলেও নির্বাচনের ব্যবস্থা করেনি। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধ্যাদেশ জারি করে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের আয়োজন করে। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এই অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করেনি।

এতে করে যে অধ্যাদেশবলে উপজেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়েছিলেন, তারা আর সে অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে উপজেলা পরিষদ আইন করে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের উপজেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে উপজেলা পরিষদ কার্যত সংসদ সদস্যদের দয়া ও সরকারি কর্মকর্তাদের কর্তৃত্বে চলে যায়। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্য দিয়ে কার্যত স্থানীয় সরকারের সর্বজনীন চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়। ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের অধিকাংশই আত্মগোপনে চলে যান। জেলা ও উপজেলা পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার প্রায় সব শীর্ষ পদই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দখলে ছিল। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল। পরে দেশের সব (৪৯৩টি) উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা হয়। তাদের জায়গায় সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।