কোর্টপাড়ায় বিএনপির রাজনীতি: কে বাঁধবে বিড়ালের গলায় ঘন্টা?
সান নারায়ণগঞ্জ
‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধা’ বাগধারাটির প্রচলিত অর্থ হলো-‘বিপদজনক বা কঠিন কাজের ঝুঁকি নেওয়া কিংবা কোনো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে এগিয়ে যাওয়া কিংবা কোনো জটিল কাজের গোরাপত্তন করা।’ নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালতপাড়ায় বিএনপির আইনজীবীদের প্রতিযোগীতার রাজনীতি থেকে অনৈক্য কিংবা বিরোধ বা গ্রুপিং রাজনীতি চরম আকার ধারণ করেছে। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের আইনজীবী নেতাদের মাঝে এমন প্রকাশ্য বিরোধ ও গ্রুপিংয়ের কারনে বিপাকে পড়েছেন বিএনপির কর্মী সমর্থক ও অনুগামী সাধারণ আইনজীবীরা। দুটি গ্রুপিংয়ের শীর্ষ নেতারা যার যার পক্ষ ভারি করার জন্য আইনজীবীদের পক্ষাবলম্বনে নেয়ার চেষ্টা করছেন। নিরপেক্ষ আইনজীবীরা পড়েছেন আরো বিপদে, তারা কোন গ্রুপে অবস্থান নিলে তাদের ভবিষৎ অবস্থান ভালো হবে, সেটা ভেবেই দুঃচিন্তায় মগ্ন।
তবে এই কঠিন পরিস্থিতির সমাধানে কে উদ্যোগ নিবে সেটাই এখন বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সর্বজন শ্রদ্ধেয় অ্যাডভোকেট আব্দুল বারী ভুঁইয়া উভয়পক্ষকে নিয়ে বসে সমাধানের উদ্যোগ নিয়ে উভয়পক্ষকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। সে বিষয়ে দুইপক্ষের কেউ আগ্রহ দেখিয়েছে বলে মনে হয়নি। আইন পেশায় অনেক সিনিয়র আইনজীবীর চেয়ে সিনিয়র না হলেও বিএনপির মাদার সংগঠন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হিসেবে অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু অভিভাভকের ভুমিকা নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজেই একটি পক্ষের বিপরীতে ও একটি পক্ষে অবস্থান নিয়ে নেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন ও সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট কাজী আব্দুর গাফফারও দুইপক্ষের আইনজীবীদের বিরোধ মীমাংসা করার উদ্যোগ নিতে পারেননি। আইনজীবী সমিতির দুই অভিভাবক সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবির ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনোয়ার প্রধান সরাসরি দুটি পক্ষে বিভক্ত। ঠিক তখনি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আইনজীবীদের দুইপক্ষের বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে কে উদ্যোগ নিবেন এবং কে বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবেন। অর্থাৎ এর সমাধানের পথ দেখাবেন?
এবার ঘটনা চক্র, গত ৬ অক্টোবর আইনজীবী সমিতির কিছু সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আইনজীবী সমিতির দ্বিতীয় তলায় সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবিরের কক্ষে বসেন আইনজীবী সমিতির একাধিকবারের সাবেক সভাপতি, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও নাসিকের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। পাশেই সমিতির সেক্রেটারি আনোয়ার প্রধানের কক্ষের পর সমিতির সভাকক্ষ। সেই কক্ষ থেকে কিছু উচ্চবাচ্চ ও শব্দ নিয়ে সেখানে গিয়ে আপত্তি জানান সাখাওয়াত হোসেন খান। এ নিয়ে পিপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকিরের সঙ্গে মৃদু তর্ক হয়। বিপুল সংখ্যক গণমাধ্যম কর্মীদের উপস্থিতিতে আইনজীবীদের মধ্যে মৃদু ধাক্কাধাক্কি হলেও সেটা প্রচারণার কারনে দেশব্যাপী আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে যা জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতেও প্রকাশিত নিউজে বুঝা যায়।
ওই দিনের ঘটনায় সাখাওয়াতের সঙ্গে জুনিয়রদের অশোভন আচরণ যেমন সাধারণ আইনজীবীদের মনে চির কেটেছে, আবার পিপি আবুল কালাম আজাদ জাকিরের হাতে ব্যান্ডিস ও আঙ্গুলে প্লাস্টারের দৃশ্যটিও আইনজীবীদের মনে দাগ কেটেছে। এরপর আড়ালে আভাসে আকারে ইঙ্গিতে যেসব কর্মসূচি চলছে সেটা একে অপরের বিপরীতে সেটা বুঝার জন্য কোনো আইনজীবীকে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ হতে হবে না। এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি নিয়ে নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি দেখতে চায়না সাধারণ আইনজীবীরা। সাধারণ আইনজীবীরা চান, সিনিয়র আইনজীবী নেতাদের মাঝে সোহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। যেখানে আইনজীবী নেতাদের নেতৃত্বে সাধারণ আইনজীবীরা রাজনীতি যেমন করবেন, ঠিক তেমনি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে আইন পেশা পরিচালনা করবেন।
সমস্যা চিহ্নিত করতে গিয়ে দুইপক্ষের আইনজীবীদের মুখে ভিন্ন ভিন্ন ইস্যুর কথা শোনা যায়। কেউ কেউ বলছেন, দুই কোর্ট একসঙ্গে রাখা নিয়ে বিরোধ, কেউ কেউ বলছেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত স্পেশাল পিপি আইনজীবীকে বসানো নিয়ে বিরোধ, আবার কেউ কেউ বলছেন সমিতির আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্যানেলে সভাপতি ও সেক্রেটারি প্রার্থীতা চূড়ান্ত করা নিয়ে বিরোধ। সাধারণ আইনজীবীরা বলছেন, দুই কোর্ট একসাথে রাখার বিষয়টি নিয়ে সকল আইনজীবী নেতারা বসেই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমাধান করতে পারবেন। স্পেশাল পিপি নিয়োগ বিষয়টি যদিও সরকার ও সরকারি দলের বিষয়। সেটা বিএনপির দুইপক্ষের সিনিয়র আইনজীবী নেতারা বসেই সমাধান করতে পারতেন বা পারেন। একইভাবে বিএনপির দলীয় বিষয় হলো আগামীতে কে বা কারা বিএনপির সমর্থিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হবেন সেটার চূড়ান্ত বিএনপিকেই করতে হবে। বিএনপি পন্থী অধিকাংশ সাধারণ আইনজীবীরা চান গত নির্বাচনের মতই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আইনজীবী ফোরাম ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করুক। কিন্তু এ নিয়েও আপত্তি কজনের, যেখানে তাদের দাবি প্রার্থী ও নেতৃত্বের পরিবর্তন হলে অন্যান্য আইনজীবীদের মুল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
সর্বশেষ দেখার বিষয়, কার মাধ্যমে কিংবা কার নেতৃত্বে বিএনপির দুইপক্ষের আইনজীবীদের এমন নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থেকে তৈরিকৃত বিরোধ মিটিয়ে শক্তিশালী ঐক্যবদ্ধ বিএনপির আইনজীবী ফোরাম প্রসারে ভুমিকা রাখেন। কে নিবেন এমন জটিল বিরোধের সমাধানের উদ্যোগ?
