ঝাঁঝালো বক্তৃতায় ফাটিয়ে দিচ্ছেন এমপি মান্নান: ছাড় পায়নি পুলিশ প্রশাসন তিতাস বিআইডব্লিউটিএ!

সান নারায়ণগঞ্জ

একের পর এক ঝাঁঝালো বক্তৃতায় রীতিমত ফাঁটিয়ে দিচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ-৩(সোনারগাঁও-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান। অনেকেই মনে করতেন এমপি মান্নান বক্তৃতা দিতে জানেন না। কিন্তু তিনি এতদিন চুপসে ছিলেন। গেল দুই সপ্তাহ ধরে তিনি তার ঝাঁঝালো বক্তৃতায় নিজের জাত চিনিয়েছেন। তার বক্তব্যে পুলিশ প্রশাসনে ও নারায়ণগঞ্জের মাদক কারবারীরা আতংকিত হয়ে পড়েছেন। কারন তিনি তার বক্তব্যে কোনো দুর্নীতিবাজ চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের ছাড় দিচ্ছেন না। শুধু তাই নয়, নিজের দলের সমালোচনা করতেও কুণ্ঠাবোধ করছেন না এমপি মান্নান।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে পুলিশ ও প্রশাসনে গোপালগঞ্জের অর্থাৎ গোপালীতে ভরে গেছে বলে এমপি মান্নানের এমন বক্তব্যের তিন দিনের মাথায় জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সীকে হাইওয়ে পুলিশে বদলী করা হয়েছে। ছাড় দেননি তিতাসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারী এবং বিআইডব্লিউটিএ এর কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও। তিতাসের বিরুদ্ধে অবৈধ গ্যাস দিয়ে ঘুষ গ্রহণ ও নদীপথে বিআইডব্লিউটিএ এর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেছেন।

জানাগেছে, গত ৯ আগস্ট রবিবার নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেন, ‘ একটি কথা বললে এসপি সাহেবের উপরেও চলে যাবে। আমি আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছেও বলবো। ৫ আগস্টের আগে নারায়ণগঞ্জ জেলায় পুলিশ প্রশাসনে গোপালী (গোপালগঞ্জ) দিয়ে ভরে গিয়েছিল। এখন আবার ঘুরেফিরে গোপালী পুলিশ দিয়ে ভরে গেছে। পুরো নারায়ণগঞ্জ জেলা ভরে গেছে। আইনশৃঙ্খলা কীভাবে সুন্দর হবে? গোপালীরা কী আমাদের ভালো চাইবে? ভালো চাইবে না।’

জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এমপি মান্নান বলেন, ‘এটার তালিকা চাই আমরা। কার বাড়ি কোথায়, এই নারায়ণগঞ্জে কোন থানার মধ্যে কে আছে, তার তালিকা চাই আমরা। ঘুরেফিরে আবার ওই গোপালী দিয়ে ভরে গেছে পুরো নারায়ণগঞ্জ।’

এ ছাড়াও তিনি এ সময় বালুবাহী বাল্কহেড থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও তোলেন তিনি। এতে বিআইডব্লিউটিএ এর কর্মকর্তাগণ জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ তুলে এমপি মান্নান বলেন, ‘ সদর বন্দর ও সোনারগাঁয়ের মাঝখানে ব্রক্ষপুত্র নদ। মেঘনা থেকে বা বিভিন্ন নদী থেকে যে বালুর বাল্কহেডগুলো প্রবেশের আগেই তাদের চাঁদা শুরু হয়ে যায়। আবার নাকি মোবাইলে চাঁদা দিয়ে দেয়, কীভাবে দেয় জানি না। এর সঙ্গে বিআইডব্লিউটিএ জড়িত।’

তিনি অবৈধ গ্যাস ও তিতাসের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির বিষয়ে বলেন, আওয়ামীলীগের আমলে তিতাসের কর্মকর্তারা দুর্নীতির মাধ্যমে আওয়ামীলীগের নেতাদের দিয়ে সোনারগাঁও উপজেলা জুড়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়। এখন আবার তারা চুনা ফ্যাক্টরীগুলোতে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিচ্ছে। এসব দূর্নীতির সঙ্গে সরাসরি তিতাসের কর্মকর্তা কর্মচারীরা জড়িত। সেজন্য সোনারগাঁয়ের মানুষকে বলেছি, গ্যাস লাইন কাটতে আসলে সবার আগে তিতাসের দূর্নীতিবাজ ঘুষখোর কর্মকর্তা কর্মচারীদের পিটাইবেন, কারন তারা অবৈধ গ্যাস দিলো কেন?

এ ছাড়াও তিনি নিজ দলের সমালোচনা করতেও ছাড়েননি। গত ৬ আগস্ট বৃহস্পতিবার বিকেলে জেলা পরিষদ সংলগ্ন একটি মাঠে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদের উদ্দেশ্যে সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেছেন, যারা স্বৈরাচারী সরকার আমলের ১৭ বছর জেল জুলুম অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদেরকে আজকে আমরা মুল্যায়ন করছি না, ৫ই আগস্টের পর বিএনপিতে এসেছে আমরা তাদেরকে মুল্যায়ন করছি, কেন করি? অর্থলোভে করি! কিসের অর্থ? কেন এই অর্থ?

তিনি অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও এমপি আবদুস সালাম আজাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, কেন তৃণমুলকে আপনারা সরিয়ে দিচ্ছেন? তৃণমুলকে কথা বলতে দেন না। তৃণমুলকে রাজপথে থাকতে দেন না। তৃণমুলকে কেন মুল্যায়ণ করেন না? এই প্রশ্নে রেখে বক্তব্য শেষ করলাম।

এমপি মান্নান সকলের প্রতি প্রশ্ন রেখে সরকারি তোলারাম কলেজসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের সংঘর্ষের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গতকাল ফেসবুকে দেখলাম। শিবিরের হাতে মাইর খাচ্ছে ছাত্রদল! কেন? কেন সরকারের ৫ মাসের মাথায় বিএনপির নেতাকর্মীরা শিবিরের হাতে মাইর খাবে? সেই প্রশ্ন রাখেন প্রধান অতিথির বরাবর।

এরপর গত ১১ আগস্ট মঙ্গলবার বিকেলে সিদ্ধিরগঞ্জের ৩নং ওয়ার্ডের মাদানীনগর এলাকায় এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন। ‎সভায় নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় না পেলে মাদকসেবী ও কারবারিদের টিকে থাকা কঠিন।

‎তিনি বলেন, ‘আমরা যারা সরকারি দলের সঙ্গে আছি এবং রাজনীতি করি, যদি আমাদের কাছে মাদকসেবীরা আশ্রয় না পায়, তারা কিন্তু টিকতে পারবে না।’ তিনি সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জসহ সব এলাকার রাজনৈতিক নেতাদের মাদকবিরোধী অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। সভায় তিনি মাদক ব্যবসায়ীদের হাত পা ভেঙ্গে বেধে পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার আহ্বান জানান।

‎তিনি আরও বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় কে মাদক সেবন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, সে বিষয়ে তাঁর ধারণা রয়েছে। নির্বাচিত হওয়ার আগেও তিনি এ এলাকায় নিয়মিত এসেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সবই আমি জানি এবং চিনি। এবার অনুরোধ করছি, এরপরে কিন্তু রেহাই পাবেন না।’