এমপি মান্নানের সঙ্গে সেলিমের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যেভাবে অন্যতম চালিকাশক্তি

সান নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জ-৩(সোনারগাঁও-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে বিএনপির নবনির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য (এমপি) আজহারুল ইসলাম মান্নানের বিজয়ের বিরাট অংশজুড়ে আছেন সেলিম হোসেন দিপুর নামটি। তিনি জেলা কৃষকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও সোনারগাঁও উপজেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক পদে থাকলেও তিনি মুলত পিএস সেলিম হোসেন দিপু নামে ব্যাপক সুপরিচিত। তিনি পরিচয়ে পিএস হলেও এমপি মান্নানের রাজনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এই সেলিম। যে কারনে গত ৩রা নভেম্বর এমপি মান্নানকে বিএনপি প্রাথমিকভাবে মনোনিত প্রার্থী ঘোষণা করার পর সেলিম এমপি মান্নানের হাতে ধানের শীষ তুলে দিলে সেটা সেলিমের হাতে তুলে দিয়ে মান্নান বলেছিলেন, ‘এটা তোর প্রাপ্য।’ সেলিমকে নিজেদের পরিবারের সদস্য হিসেবেই মনে করেন এমপি মান্নানপুত্র জেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবও। এতেই অনেকের গাত্রদাহ।

সিদ্ধিরগঞ্জে নির্বাচনী মাঠ ঘোছাতে সেলিমের ভুমিকা:

এবারের নির্বাচনে নতুন করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন ১০টি ওয়ার্ড সোনারগাঁয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেয় নির্বাচন কমিশন। নতুন এই এলাকা সিদ্ধিরগঞ্জে মান্নান ও সজীবের পরামর্শে সেলিম হোসেন দিপুর কারিশমায় নির্বাচনী মাঠ ঘুচিয়ে নেন এমপি মান্নান। এ কারনে সেলিমকে দোষারোপও করেছিলেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দীন। ১০ ডিসেম্বর বুধবার দুপুরে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির ব্যানারে এক অনুষ্ঠানে গিয়াসউদ্দীন বলেছিলেন, ‘মান্নান সাহেব প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন পেয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের যেসব নেতাকর্মী আমাদের বিরুদ্ধাচারণ করেন, সেইসব নেতাকর্মীদের তার পিএস ও লোক দিয়ে খুঁজে বের করলেন। আমাদের বিরুদ্ধাচারণ করা সেইসব নেতাকর্মীদের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে উনার বাড়িতে নিয়ে গেলেন এবং আমাদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেয়ার আয়োজন করে দিলেন, যেখানে আমাদের বিরুদ্ধে এমন ভাষায় বক্তৃতা করছে, তা নিয়ে আনন্দ উল্লাস করছেন তার ছেলে ও পিএস সহ তার পরিষদবর্গ।’ সিদ্ধিরগঞ্জে সেলিমের ঘোচানো মাঠকে নির্বাচনের পুর্বে কেউ কেউ নষ্ট করে আশানুরুপ ফলাফল প্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি করেছেন।

যেসব কারনে ষড়যন্ত্রকারীদের টার্গেটে সেলিম:
এদিকে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতে, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য, জেলা বিএনপির সদস্য ও সোনারগাঁও উপজেলা বিএনপির সভাপতি বর্তমান এমপি আজহারুল ইসলাম মান্নানের একান্ত বিশ্বস্ত ও বিএনপির নিবেদিত কর্মী সেলিম। সোনারগাঁয়ে সেলিম যুবদল, কৃষকদল ও মৎস্যজীবী দলে ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ পদে। রাজনীতির সঙ্গে সমানতালে মান্নানের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে আসছেন নিষ্ঠার সাথে। সোনারগাঁয়ে মান্নানের রাজনৈতিক অবস্থান বেশ পাকাপোক্ত করে গড়ে তোলার পেছনেও অন্যতম কারিগড় তিনি। সেই মান্নানের রাজনৈতিক অবস্থানকে দূর্বল করতে হলে সবার আগে এমপি মান্নানের পাশ থেকে সরাতে হবে সেলিমকে- সে কারনে মান্নানবিরোধীদের এমন ষড়যন্ত্রে ও চক্রান্তে বারবার টার্গেটে পরিনত হয়েছিলেন সেলিম।

স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, আওয়ামীলীগ সরকারের বিগত সাড়ে ১৫ বছর দলের কঠিন সময়েও বারবার চক্রান্ত ও বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন সেলিম। ৫ আগস্টের পর থেকে একাধিকবার সেলিমকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা হয়েছে। ষড়যন্ত্রকারীরা অনেক ক্ষেত্রে সেলিমের বিরুদ্ধে মান্নানের কানভারী করার চেষ্টাও করতেন। সেই ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত আছে সেলিমের বিরুদ্ধে। মান্নান পরিবারের কাছে সেলিমের অবস্থানটি নতুন করে দখলের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন কেউ কেউ।

মান্নান পরিবারের অন্যতম সদস্য সেলিম:
রাজপথের নেতাকর্মীরা বলছেন, বিএনপির একটি রাজনৈতিক পরিবার থেকে ওঠে আসা সেলিম। বারদী ইউনিয়নের স্থানীয় সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন পরিবারের সন্তান হয়েও নিরেট একজন সাধারণ মানুষের মত চলাফেরা তার। অহমিকা অহংকার দাম্ভিকতা তার দ্বারে কাছেও নাই। দলের জন্য অঢেল ত্যাগ স্বীকার করে আসলেও নিজেকে বিএনপির একজন সামান্য কর্মীই মনে করেন তিনি। সেই বিএনপির একজন সামান্য কর্মীকেই টার্গেট করেছে চক্রান্তকারীরা বারবার। মান্নানের পুত্র জেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীব এ প্রতিবেদকের কাছেও অতীতে একাধিকবার স্বীকার করেছেন, “সেলিম হোসেন দিপুকে আমরা আমাদের পরিবারের একজন সদস্য মনে করি।”

স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, ১/১১ এর সময় থেকে সেলিম মান্নানের ঘনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কাজ করে আসছেন। উপজেলা বিএনপির প্রতিটা নেতাকর্মীদের মুখে সেলিম হোসেন দিপুর নামটি সুপরিচিত। বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছর সেলিম সোনারগাঁও উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের হামলা মামলা নির্যাতনের বিষয়ে অবগত।

দলের পক্ষে আনুসঙ্গিক কার্যক্রমে সেলিমের অবদান:
কারন মান্নানের নির্দেশনায় সেলিম নেতাকর্মীদের জামিনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আইনজীবীর কাছে দৌড়ানো, কাগজপত্র সরবরাহ করা, কারাবন্দী নেতাকর্মীদের বাসায় মান্নানের বার্তা ও শুভেচ্ছা উপহার পৌছে দেয়া, প্রতিটি ঈদে কারাবন্ধি নেতাকর্মীদের বাসায় মান্নানের শুভেচ্ছা উপহার পৌছানো, খোঁজখবর রাখা, জেলখানায় নেতাকর্মীদের জন্য খরচ পাঠানো, জেলখানার ভেতরে নেতাকর্মীদের খোঁজখবর রাখা, জামিনের জন্য নারায়ণগঞ্জ কোর্ট থেকে হাইকোর্ট পর্যন্ত দৌড়ানো, মামলার নথিপত্র নিয়ে দৌড়ানো, জামিননামা নিয়ে কোর্ট থেকে জেলখানায় পৌছানোর ব্যবস্থা করা, জেলগেটে নেতাকর্মীদের রিসিভ করা, নেতার্মীদের রিমাণ্ডে নেয়া হলে থানায় নেতাকর্মীদের গারদে খাবারের ব্যবস্থা করা সহ হাজারো রকমের কাজগুলো করেছেন সেলিম হোসেন দিপু, যা লিখে বলে শেষ করা যাবে না।

মান্নানের নির্দেশনায় আধিষ্ট হয়ে এসব হরেক রকম কাজগুলো সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের জন্য কাজ করেছেন সেলিম। শুধু এসবই নয়, দলের প্রতিটা কর্মসূচিতে ব্যানার ফ্যাস্টুন তৈরি করা, গাড়ি ভাড়া করা, নেতাকর্মীদের জমায়েত করানোর ব্যবস্থা, নিরাপদ স্থান নির্ধারণ করা, নেতাকর্মীদের নির্দিষ্ট স্থানে গোপনে গিয়ে উপস্থিত করানো সহ এসব পুরো কাজগুলো করেছেন সেলিম।

সরকারের কঠোর ভুমিকার সময়ও নেতাকর্মীদের নিয়ে কখনো নারায়ণগঞ্জে, কখনো ঢাকায় সমাবেশগুলোতে গোপনে নেতাকর্মীদের নিয়ে জমায়েত হতেন সেলিম। রাতভর নেতার্মীদের নিয়ে বনে বাদারে জঙ্গলে ঘুমিয়েছেন, আবার ভোর হলেই দলের কর্মসূচি পালনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন নারায়ণগঞ্জে কিংবা ঢাকায়। এভাবে হরতাল অবরোধ বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি পালন করে আবার নেতাকর্মীদের যার যার মত করে নিরাপদে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন এবং অনেক নেতাকর্মীদের নিয়ে আবার রাতের আধারে বনে বাদারে জঙ্গুলে ঘুমিয়েছেন।

জুলাই আন্দোলনে সেলিমের ভুমিকা:
৫ আগস্ট স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকার পতনের পূর্বে জুলাই মাসব্যাপী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র জনতা আন্দোলনেও সরব ছিলেন সেলিম। পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার আগে থেকেই ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জের চিটাগাংরোড ও সোনারগাঁয়ের কাঁচপুর, বন্দরের মদনপুর এলাকায় ছাত্র জনতা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ওই সময় মান্নানের নির্দেশনায় সেলিম আন্দোলনকারীদের মাঝে পানি সরবত ও শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন। নেতাকর্মীদের নিয়ে লাঠিসোটা হাতে আন্দোলনও করেছেন সমানতালে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের আগ পর্যন্ত রাজপথে থেকেছেন সেলিম।

সন্তানকে নিয়ে জঙ্গলে ঘুমিয়েছেন সেলিম:
গত জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে হরতাল অবরোধ পালন করতে গিয়ে নদীর পাড়ে, বন বাদারে জঙ্গলে ঘুমিয়েছিলেন সেলিম। তার কলেজ পড়ুয়া ছেলে ছাত্রদল নেতা সামিকে নিয়ে জঙ্গলে নদীর পাড়ে ঘুমানোর দৃশ্যের ভিডিও প্রকাশিত হলে তা নিয়ে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়, তা ভাইরাল হয়ে যায়।

করোনাকালে সেলিমের ভুমিকা:
করোনাকালে সেলিম হোসেন দিপুর কর্মকাণ্ড ছিল আরো চোখে পড়ার মত। মান্নানের উদ্যোগে খাদ্য সামগ্রী উপজেলার অসহায় দুঃস্থ পরিবারের মাঝে নিজে কাঁধে বস্তা নিয়ে পৌছে দিয়েছেন তিনি। যখন ধান কাটার জন্য কৃষকেরা শ্রমিক পাচ্ছিলোনা তখন কৃষকদলের, মৎস্য দল, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের নিয়ে কৃষকের ধান কেটে ঘরে তুলে দিয়েছেন মান্নানের নির্দেশনায় সেলিম।

সার্বিকভাবে সেলিমের ভুমিকা:
এসব কর্মকাণ্ডগুলো দলের জন্য এবং মান্নানের নির্দেশনায় আধিষ্ট হয়ে বিচক্ষণতার সহিত কাজগুলো করতে পারায় মান্নানের বিশ্বস্ত কর্মীতে পরিনত হোন সেলিম। কেউ কেউ মনে করেন সেলিম তার দক্ষতায় কাজকর্মে মান্নানের শরীরের একটা অংশে পরিনত হয়েছেন। সোনারগাঁও উপজেলা বিএনপি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নানান বিষয়ে মান্নান পিএস সেলিমের কাছ থেকেও খোঁজখবর নেন। আর এতেই সেলিমকে নিয়ে অনেকের গাত্রদাহ শুরু হয়। অনেকে মনে করতেন, সেলিমের কথায় মান্নান অনেকের পদ আটক রেখেছেন, অনেককে বড় পদে বসাচ্ছেন না। কিন্তু সেলিম এসবের দ্বারে কাছেও ছিলেন না। মান্নান তার নিজস্ব আরো অনেকের মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীদের সম্পর্কে এবং অনেকের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখেন। সেলিম কখনও মান্নানের কাছে কারো বিরুদ্ধে কানপড়া দেন না।

এসব কারনে মান্নানের কাছ থেকে সেলিমকে সরাতে বিএনপির একটি চক্রান্তকারী গোষ্টি মাঝে মাঝে সেলিমের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে আসছেন। মান্নানবিরোধীদের অনেকে মনে করে, মান্নানের কাছ থেকে সেলিমকে সরাতে পারলে মান্নানের হাতকে দূর্বল করা যাবে। কারন সেলিমের মত আরেকজন কর্মঠ ও পরিশ্রমী বিশ্বস্ত লোক পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে মান্নানের জন্য।

সেলিমের আত্মীয়স্বজনেরাও হামলা মামলা নির্যাতনের শিকার:
গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর সেলিমকে নিয়ে চক্রান্ত শুরু হয়। তার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও অপপ্রচার করে মান্নানের কাছ থেকে তাকে সরানোর অপচেষ্টা চলে। সেলিম হোসেন দিপু শুধুমাত্র মান্নানের পিএস হিসেবেই কাজ করছেন তা নয়, বরং বিএনপির রাজনীতিতে রাজপথের অগ্রনী সৈনিক হিসেবে রাজনীতি করছেন। দুই ডজন মামলার আসামী হয়েছেন সেলিম। সেলিমের পিতা, চাচা, জেঠা, খালু, ফুফাসহ আত্মীয় স্বজনদের পুরুষ সকলেই রাজনৈতিক মামলায় আসামী হয়েছেন এবং অনেকে জেল খেটেছেন। সেলিম জেলা যুবদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সাবেক আহ্বায়ক, উপজেলা কৃষকদলের আহ্বায়কসহ বিভিন্ন পদে ছিলেন। বর্তমানের তিনি উপজেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও জেলা কৃষকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক পদেও রয়েছেন। রাজনীতিও করছেন সমানতালে। এর আগে বারদী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ধানের শীষ প্রতীকে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনও করেছিলেন সেলিম হোসেন দিপু।