সহজ জয়ের পথে দিপু ও মান্নান: শঙ্কায় কাসেমী, লড়াইয়ে আজাদ ও কালাম!

সান নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জ জেলার ৫টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৪টি আসনে বিএনপি তাদের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী দিয়েছে এবারের নির্বাচনে। বাকি ১টি আসন বিএনপি তাদের নেতৃত্বাধীন শরীক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে ছেড়ে দিয়েছে, যেখানে পরাজয়ের শঙ্কায় ভুগছে জোটের প্রার্থী হিসেবে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী। বিএনপির দুটি আসনে সহজ জয়ের পথে আছেন মোস্তাফিজুর রহমান দিপু ভুঁইয়া ও আজহারুল ইসলাম মান্নান। অপর দুটি আসনে মোটামুটি লড়াই করেই জয়ী হতে হবে বিএনপির দুই প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ ও আবুল কালামকে। এর মধ্যে একটি আসনে বিএনপি হোচট খেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণে এমনটাই তথ্য পাওয়া গেছে নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনে।

নারায়ণগঞ্জ-১(রূপগঞ্জ) আসন:

এখানে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে মনোনিত প্রার্থী বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান দিপু ভুঁইয়া। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী জাহাজ প্রতীকে স্বতন্ত্র হয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. দুলাল হোসাইন। তিনি বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে ধানের শীষের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেছেন। এখানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে আনোয়ার হোসেন মোল্লা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতায় থাকলেও দিপু ভুঁইয়ার সহজ জয় হবে মনে করছেন স্থানীয়রা। এখানকার বিএনপির হেভিওয়েট মনোনয়ন প্রত্যাশি কাজী মনিরুজ্জামান মনির দিপু ভুঁইয়ার পক্ষে মাঠে আছেন। নির্বাচনে যারা প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন কার্যত দিপু ভুঁইয়ার সামনে দূর্বল মনে করছেন স্থানীয়রা। এখানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মো. ইমদাদুল্লাহ, সিপিবির কাস্তে প্রতীকের প্রার্থী মনিরুজ্জামান চন্দন, গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী ওয়াসিম উদ্দিন ও ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের আপেল প্রতীকের প্রার্থী মো. রেহান আফজাল থাকলেও তারা দিপু ভুঁইয়ার সামনে লড়াই করার মত সক্ষমতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসন:

এই আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে মনোনিত প্রার্থী বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ। তবে তার শক্ত প্রতিদ্বন্ধি বিএনপির সাবেক তিনবারের এমপি আতাউর রহমান খান আঙ্গুর কলস প্রতীকে আজাদকে বেশ বেকায়দায় ফেলেছেন। উত্তরাঞ্চলের চেয়ে দক্ষিণাঞ্চলে তিনগুণ ভোট, যেখানে ব্যাপক জনপ্রিয় আঙ্গুর। নির্বাচনের শুরুতেই আজাদের মনোনয়ন বাতিল চেয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন আতাউর রহমান খান আঙ্গুর, বিএনপির সহ-অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহামুদুর রহমান সুমন, কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক পারভীন আক্তার ও যুক্তরাষ্ট্র সেন্ট্রাল বিএনপির সাবেক সভাপতি নুরুল ইসলাম নুরু মিয়া। আজাদের ধানের শীষের পক্ষে এসব নেতাদের নামাতে পারেনি। তবে ভেতরে ভেতরে এসব নেতাদের সমর্থন আঙ্গুরের কলস প্রতীকের দিকেই। এখানে কলস প্রতীকের প্রার্থী আঙ্গুরের সঙ্গে হোচট খেতে পারেন আজাদ। এখানে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ইলিয়াস মোল্লা পরিচিত মুখ হলেও জোরালোভাবে সারা জাগাতে পারেনি ভোটারদের মাঝে। তবে কেউ কেউ মনে করছেন বিএনপির দুই প্রার্থী থাকায় দাঁড়িপাল্লাও লড়াইয়ে থাকবে সমানে সমান। এখানে সিপিবির কাস্তে প্রতীকের প্রার্থী হাফিজুল ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী কামরুল মিয়া, ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা মো. হাবিবুল্লাহ ও বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির হাতি প্রতীকের প্রার্থী আবু হানিফ হৃদয় ভোটারদের মাঝে সারা জাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসন:

এই আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সোনারগাঁও উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নান সহজ জয়ের পথে আছেন। বিএনপির সাবেক এমপি ও মন্ত্রী রেজাউল করিম ঘোড়া প্রতীক এবং বিএনপির সাবেক এমপি মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দীন ফুটবল প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। তবে বিএনপি থেকে তাদের দুজনকে এবং তাদের অনুগামীদের বহিষ্কারের পর তারা এই আসনে ভোটারদের মাঝে সারা জাগাতে পারেনি। তাদের অনুগামীদের বেশির ভাগ নেতাকর্মীরা বহিষ্কার ঠেকাতে ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে কাজ করছেন। গিয়াসের পাশে দুএকজন বহিষ্কৃত নেতা থাকলেও রেজাউল করিমের পাশে কেউ নাই। এ ছাড়াও নানা নাটকীয়তার পর জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ইকবাল হোসেন ভুঁইয়াকে বহাল করেছে ১১ দলীয় জোট। স্থানীয়রা বলছেন, ইকবাল হোসেন ভুঁইয়ার চেয়েও ভোটে পিছিয়ে থাকতে পারেন গিয়াস ও রেজাউল করিম। ফলে সহজ জয়ের পথে মান্নান। এখানে গণসংহতি আন্দোলনের মাথাল প্রতীকের প্রার্থী অঞ্জন দাস, খেলাফত আন্দোলনের বটগাছ প্রতীকের প্রার্থী আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী, ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী গোলাম মসীহ, জনতার দলের কলম প্রতীকের প্রার্থী আবদুল করিম মুন্সী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিক্সা প্রতীকের প্রার্থী মো. শাহজাহান, আমার বাংলাদেশ পার্টির ঈগল প্রতীকের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম ও গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী মো. ওয়াহিদুর রহমান মিল্কী প্রতিদ্বন্ধিতায় থাকলেও ভোটারদের মাঝে জোরালো সারা ফেলতে পারেননি। এরি মাঝে ভোটে থাকা রিক্সা প্রতীকের প্রার্থী শাহজাহানকে বসিয়ে দিয়েছে তার দল।

নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা থানা, গোগনগর ও আলীরটেক ইউনিয়ন) আসন:

এখানে বিএনপি তাদের দলীয় প্রতীক ধানের শীষের কোনো প্রার্থী দেয়নি। এখানে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরীক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে এই আসনটি ছাড় দেয় বিএনপি। এখানে জমিয়তের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে খেজুর গাছ প্রতীকে মনোনয়ন দেয় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। কিন্তু এই আসনে বিএনপি থেকে দুইজন বিদ্রোহী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। এখানে ভোটের মাঠে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন হরিণ প্রতীকের প্রার্থী শিল্পপতি মুহাম্মদ শাহআলম। এরপরের অবস্থানে আছেন ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী বিএনপির সাবেক এমপি মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দীন। এদের দুজনকেই বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। এরপর লড়াইয়ে আছেন বিএনপির সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী, যিনি বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির হাতি প্রতীকের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনিও জয়ের আশা ছাড়ছেন না। এখানে বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মীরা শাহআলমের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কিছু নেতাকর্মী আছেন গিয়াসের সঙ্গে। কাসেমীর সঙ্গে যারা আছেন তাদের মধ্যে একমাত্র সদ্য দলে ফিরা মনিরুল আলম সেন্টু বাদে আর কারোই ভোটের মাঠে জনপ্রিয়তা নাই। এই আসনে জামায়াতের নিজস্ব প্রার্থী না থাকায় শাহআলমের অবস্থান আরো বেশি পাকাপোক্ত হয়েছে। ফলে কাসেমীর এখানে জয় পাওয়া দূরহ হয়ে ওঠেছে। জয়ের সম্ভাবনায় আছেন শাহআলম। এখানে জামাত জোটের প্রার্থী হিসেবে আছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন, ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মুফতি ইসমাইল কাউসার হাতপাখা, বাসদের মই প্রতীকের প্রার্থী সেলিম মাহমুদ মই, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিক্সা প্রতীকের প্রার্থী আনোয়ার হোসেন, জাসদের মশাল প্রতীকের প্রার্থী মো. সুলাইমান দেওয়ান, সিপিবির কাস্তে প্রতীকে ইকবাল হোসেন, গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকে আরিফ ভূঁইয়া, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির একতারা প্রতীকে সেলিম আহমেদ ও জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী সালাউদ্দিন খোকা মোল্লা ভোটারদের মাঝে সারা ফেলতে পারেননি। যদিও রিক্সা প্রতীকের প্রার্থী আনোয়ার হোসেনকে সরিয়ে জামাত জোটের প্রার্থী আল আমিনকে সমর্থন করেছে দলটি। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থীও।

নারায়ণগঞ্জ-৫ (নারায়ণগঞ্জ সদর-বন্দর) আসন:

অনেক নাটকীয়তার পর এই আসনে বিএনপি তাদের ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির সাবেক তিনবারের এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালামকে মনোনিত করেছে। প্রাথমিকভাবে এই আসনে আবুল কালাম সহজ জয় পাবেন বলে ধারণা করলেও দিনকে দিন এই আসনে তার জয় ছিনিয়ে আনা জটিল হয়ে ওঠেছে। এখানে লড়াইয়ে আছেন ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা জাতীয় পার্টির সহ-সভাপতি ও বন্দর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেন। বিএনপির যেসব সিনিয়র নেতাদের ভোট ব্যাংক রয়েছে তাদেরকে অবজ্ঞা করেছেন আবুল কালাম ও তার পুত্র আবুল কাউসার আশা। এমনকি বন্দর উপজেলার একাধিকবারের চেয়ারম্যান কালামের ভাই আতাউর রহমান মুকুলকেও কাছে টানতে পারেননি আবুল কালাম ও ভাতিজা আশা। ওদিকে জাতীয়পার্টি ও আওয়ামীলীগের ভোট ব্যাংক নিয়ে শক্ত অবস্থানে চলে গেছেন মাকসুদ হোসেন। সঙ্গে আছেন জামাত জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুনও। তবে শেষতক আবুল কালামের জয় সম্ভব হলেও ফুটবল ও দেওয়াল ঘড়ির সঙ্গে লড়াই করেই ভোটে জিততে হবে। এখানে গণসংহতি আন্দোলনের মাথাল প্রতীকের প্রার্থী তরিকুল ইসলাম সুজন, ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ার প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ বাহাদুর শাহ মুজাদ্দেদী, ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকে মুফতি মাছুম বিল্লাহ, বাসদের মই প্রতীকে আবু নাঈম খান বিপ্লব, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের ছড়ি প্রতীকের এইচ এম আমজাদ হোসেন মোল্লা, সিপিবির কাস্তে প্রতীকে মন্টু চন্দ্র ঘোষ ও গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকে নাহিদ হোসেন প্রতিদ্বন্ধিতা করলেও ভোটারদের মাঝে সারা ফেলতে পারেননি।