রাজনৈতিক মিটিং মিছিলে সৃষ্ট ‘কিশোর গ্যাং’ বেপরোয়া

সান নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম:

নারায়ণগঞ্জে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ‘কিশোর গ্যাং’। জেলার প্রায় প্রতিটি পাড়া মহল্লার অলিগলিতে এই কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বেপরোয়া। বিশেষ করে ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে কিশোর যুবকরাই এই গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ছে খুন ধর্ষণ সহ নানা অপকর্মে। এদের বেশির ভাগই স্কুলছুট। এরা প্রতিটি এলাকায় মাদক বিস্তারেও কাজ করছে। প্রথমত এদের অভিভাবকদের ছন্নছাড়া অভিভাবকত্ত্বহীনতার কারনে এসব সন্তানেরা কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ছে। এদের সৃষ্টির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে রাজনৈতিক দলের নেতা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মিছিলে এদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতই।

রাজনৈতিক দলের নেতাদের মিছিল সমাবেশ সফল করেই এরা পাড়া মহল্লায় এসে বেপরোয়া আচরণ করছে। নেতাদের সভা সমাবেশ মিছিল সফল করতে এদের প্রয়োজন। তাই এদের ছত্রছায়াও দিচ্ছেন রাজনৈতিক দলের নেতারাই। মুলত রাজনৈতিক দলের মিছিলের মাধ্যমেই এদের সৃষ্টি। প্রয়োজনে এরা নেতাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক সময় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এসব কিশোর গ্যাং ব্যবহার করা হচ্ছে। উর্ত্তী বয়সে এসব কিশোর যুবক তরুণদের স্বপ্ন থাকে আকাশচুম্ভিু। এ সময় তাদের রক্ত গরম। তার উপর যদি কোন রাজনৈতিক দলের নেতার ছায়া থাকে তাহলে তারা মানুষকে মানুষই মনে করছে না। নিজেকে তামিল সিনেমার হিরোর মতই ভাবতে থাকে।

একদিকে যেমন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা তার সমাবেশ মিছিল সফল করতে এদের নিয়ে মিছিলে বড় শোডাউন দিচ্ছেন। আবার অন্যদিকে বিরোধী দলের নেতারাও রাজপথ গরম করতে এদের হাতে ককটেল সহ নানা আগ্নেয়াস্ত তুলে দিচ্ছেন। ফলে এরা দুদিকেই ব্যবহৃত হচ্ছে। এদের ব্যবহার করে নিজেদের মিছিল সমাবেশ শোডাউন সফল করছেন নেতারা। এদের মধ্য থেকে কখনও কখনও তৈরি হচ্ছে শীর্ষ সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী কিংবা খুনি ধর্ষক। কিংবা বাসের হেলপার থেকে ওঠে আসা নতুন কোন নূর হোসেন।

আপনারা দেখবেন- সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন কিংবা সরকারের বাহিরের ছাত্র সংগঠনগুলোর মিটিং মিছিল সভা সমাবেশে কতজন ছাত্র অংশগ্রহণ করছে? হাতে গোনা ৮/১০ জন। মিছিলে অংশগ্রহণকারী এদের বেশির ভাগই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। এরা অন্যান্য সংগঠনের কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ করে থাকে। কিশোর গ্যাংয়ের বেশির ভাগ সদস্যরাই মাদকাসক্ত, বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় তারা মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে সহজে। অনেক নেতাদের বাড়ির আশপাশে এরা প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করে আসলেও তাদের দাপটে সাধারণ সচেতন মানুষ মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারছে না। কারন এদের শেল্টারদাতা কোন না কোন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা। যে কারনে ওইসব নেতারাও এদের লাগাম টেনে ধরতে পারছে না। কারন কিশোর গ্যাং তাদের প্রয়োজন। তার মিছিল মিটিংয়ে প্রয়োজন।

এবার আসি সম্প্রতি বেশকয়েকটি ঘটনায়। নারায়ণগঞ্জের মাসদাইর এলাকায় ১৫ থেকে ২০ বছরের কিশোরদের তান্ডবলীলা সিসিটিভিতে দেখা যায়। কিন্তু তারপর পুলিশ বাহিনী কতজনকে গ্রেপ্তার করেছে বা করতে পেরেছে তা নিয়ে বিরাট প্রশ্ন। নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ এলাকায় কুপিয়ে বেশকটি খুনের ঘটনা ঘটেছে যেখানে এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা জড়িত। যদিও দু’একজনকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও নির্মল করা যায়নি। মুলত নারায়ণগঞ্জের মাসদাইর, গলাচিপা, দেওভোগ এসব এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত সবচেয়ে বেশি। মাসদাইর গলাচিপা এলাকায় প্রতিদিন সন্ধার পর কিশোর গ্যাংয়ের মহড়া দেখলে আতংকে ওঠার অবস্থা। কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে আবার গ্রুপ রয়েছে। এক গ্রুপ আরেক গ্রপের এলাকায় যেতে পারবে না। নিয়ন্ত্রণ কিংবা মাদক বিক্রিও করতে পারবে না। এদের বেশির ভাগ অশিক্ষিত পরিবারের সন্তান। জেলার বাহিরে থেকে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পরিবারের সন্তান এরা।

আমি দীর্ঘদিন নারায়ণগঞ্জের গলাচিপায় বসবাস করেছিলাম। এই দৃশ্য আমার কাছে নতুন কিছু নয়। আমি নিজে সেই উৎপাত থেকে রক্ষা পেতে অন্যত্র চলে আসি। কখনও কারো উপরে সাইকেল তুলে দেয়, কখনও কারো উপরে লাফিয়ে পড়ে। নারীদের ইভটিজিং করে নাজেহাল করাটাও তাদের কাছে আনন্দের বিষয়। কেউ প্রতিবাদ করলে উল্টো হুমকি ধমকি। বেশি কথা বললে হবে হামলার শিকার। যে কারনে সচেতন নাগরিক এসব প্রতিরোধে এগিয়েও আসে না। অনেক সময় দেখেছি যেদিন শহরে কোন রাজনৈতিক দলের নেতারা সমাবেশ কিংবা মিছিল করেছেন সেখানেও তাদের অংশগ্রহণ। মিছিল শেষ করেই তারা এলাকায় গিয়ে প্রকাশ্যে হরদম মাদক বিক্রি বাড়িয়ে দেয়। কারন একটু আগেই বড় বড় নেতার মিছিল করে এসেছে তারা। তারা হয়ে যায় ওমুক তমুক নেতার লোক। তাই উৎসাহ উদ্দীপনায় তারা চালায় মাদক বিক্রি।

এমন দৃশ্য শুধু নারায়ণগঞ্জের শহরের এলাকায় নয়। এসব কিশোর গ্যাং জেলার প্রতিটি এলাকায় বিদ্যমান। সোনারগাঁও, আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ, বন্দর সহ অন্যান্য এলাকাতেও কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত রয়েছে বেশ। একইভাবে তারাও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতার মিটিং মিছিলে অংশগ্রহণ করে। এরা নেতাদের কথামত কারো জমি দখল করে দেয়, নেতার নির্দেশনায় কাউকে নাজেহাল করছে, নেতার নির্দেশে কাউকে মারধর করছে। ইতিমধ্যে সোনারগাঁয়ে র‌্যাবের হাতে ক্রসফায়ারে নিহত গিট্টু হৃদয় কিন্তু কিশোর গ্যাং থেকেই ওঠা আসা সন্ত্রাসী ছিল। তার আশ্রয় প্রশ্রয়দাতাও শীর্ষ এক রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন। গিট্টু হৃদয় যাকে তাকেই অস্ত্র দিয়ে কুপাতো। প্রায় প্রতিদিনই হুটহাট করে বাহিনী নিয়ে অস্ত্র হাতে মানুষকে কুপাতো। এদিকে ফতুল্লায় এক কিশোর অস্ত্র হাতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এমন ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়। কিন্তু পুলিশ কি সেই অস্ত্রটি উদ্ধার করতে পেরেছে? কে বা কারা অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দিলো তার কি কোন ক্লু বের করেছে? করেনি বা করতে পারেনি।

যদিও গত দুদিন যাবত নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে বিশেষ অভিযানে নেমেছেন। এই অভিযান কতটুকু সফল হবে জানি না। কিন্তু আমি আশাবাদী এই অভিযানে কিছুটা হলেও নির্মূল হবে। তবে এসব নির্মূলে সবার আগে রাজনৈতিক দলের নেতাদেরই এগিয়ে আসা উচিত। নেতাদের প্রতিজ্ঞা করা উচিত- ছোট ছোট ছেলেদের তার মিছিল মিটিংয়ে প্রয়োজন নেই এবং নিজেদের সমাবেশ মিছিলে মাথা বেশি দেখানোর জন্য এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নিয়ে তার কর্মসূচি সফল করতে গিয়ে সমাজটাকেই ডুবিয়ে দিচ্ছেন সেটাতেও দৃষ্টি রাখা উচিত। সেই সঙ্গে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া উচিত। পুলিশ বাহিনীকে আরো কঠোর ভুমিকা রাখা উচিত বলে আমি মনে করি। এসব ভবিষৎ প্রজন্ম কারো হাতিয়ার না হয়ে যেনো দেশের সম্পদ হয়ে ওঠতে পারে সেদিকে সকলকে নজর রাখা উচিত।

লেখক: মাজহারুল ইসলাম রোকন
সম্পাদক ও প্রকাশক, সান নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি, ঢাকা টাইমস