সোনারগাঁয়ে অবৈধ চুনা কারখানায় কোটি টাকার গ্যাস জ্বলে তিতাসের, টাকা পায় বিএনপি নেতারা!

ডেস্ক রিপোর্ট:

নারায়ণগঞ্জে সোনারগাঁও উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে প্রায় ২০টিরও বেশি চুনা ও ঢালাই কারখানা। সরকারি গ্যাস লাইন থেকে অবৈধভাবে সংযোগ টেনে এসব কারখানা চলানো হলেও, সেই গ্যাসের বিনিময়ে প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে স্থানীয় কতিপয় বিএনপি নেতারা। তবে প্রশাসনের নাকের ডগায় এই লুটপাট চললেও রহস্যজনক কারণে তা বন্ধ হচ্ছে না।

হিসাব করলে দেখা যায়, এই ২০টি কারখানায় প্রতি মাসে প্রায় ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩০০ ঘনফুট গ্যাস পুড়ছে। বর্তমান বাজারমূল্যে যার আর্থিক ক্ষতি মাসে প্রায় ১ কোটি টাকা। অথচ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এই বিপুল পরিমাণ গ্যাসের কোনো বিল পাচ্ছে না। ফলে মোটা অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

অভিযোগ উঠেছে, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উপজেলার পিরোজপুর, মোগরাপাড়া ও পৌর এলাকায় এসব অবৈধ চুনা ও ঢালাই কারখানার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। প্রশাসনকে অনেকটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দাপটের সঙ্গে এসব অবৈধ কারখানা চালিয়ে যাচ্ছে কতিপয় বিএনপি নেতারা।

জানা গেছে, এসব চুনা ও ঢালাই কারখানায় অধিক মুনাফার কারণে রাতারাতি এ ব্যবসায় ঝুঁকছে স্থানীয় প্রভাবশালী বিএনপি নেতাকর্মীরা।

তিতাস কর্তৃপক্ষ মাঝে মধ্যে দায়সারা অভিযান পরিচালনা করলেও অভিযানের কয়েকদিন পর থেকে পুনরায় চালু করা হচ্ছে একই চুনা কারখানা। একই সঙ্গে নতুন করে চুনা ও ঢালাই কারখানা গড়ে উঠতে দেখা গেছে।

সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, উপজেলা বিএনপি ও পৌর বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী সরাসরি এ অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তারা চুনা ও ঢালাই কারখানা পরিচালনার জন্য সরকারি গ্যাস লাইন থেকে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ টেনে এসব চুনা ও ঢালাই কারখানাগুলো চালাচ্ছেন।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, উপজেলার পৌর এলাকার দত্তপাড়া গ্রামে পৌর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কবির হোসেন একটি চুনা কারখানা অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে চালাচ্ছেন। তার পাশেই পৌর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী নাদিম একটি মামলাধীন জমিতে জোর করে চুনা কারখানা তৈরি করেছেন।

এ কারখানা দুটিতে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে। কারখানা দুটি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেনের বাড়ির সামনে হলেও তিনি এ অবৈধ কারখানা বন্ধে কোনো ভূমিকা রাখেননি। ফলে ওনি নিজেই এ অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এছাড়া এ কারখানা দুটি সোনারগাঁ থানা থেকে মাত্র কয়েকশত গজ দূরে। তবুও প্রশাসনও এ ব্যাপারে নির্বিকার।

পৌরসভার দৈলেরবাগ এলাকায় পৌর বিএনপির সভাপতি মো. শাহজাহান মেম্বারও একটি অবৈধ চুনা কারখানা পরিচালনা করছেন। আদমপুর এলাকায় বিএনপি নেতা জসিম একটি চুনা কারখানা চালাচ্ছেন। এছাড়া পৌরসভার দুলালপুর, লাহাপাড়া ও দিঘীরপাড়েও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এ অবৈধ চুনা কারখানা চালানো হচ্ছে।

এছাড়া, পিরোজপুর ইউনিয়নের পিরোজপুর গ্রামে ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি শফিউল আলম বাচ্চু ও তার ভাই নেয়ামত উল্লার নেতৃত্বে তিনটি অবৈধ ঢালাই কারখানা চলছে। এ কারখানাগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধ গ্যাস।

এছাড়া বিএনপি নেতা রব, জলিল, হারুন অর রশিদ, আবুল কাশেম মাস্টার, নোয়াব প্রধান, মতিউর রহমানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় নেতা ও কর্মীরা ওই ইউনিয়নের ঝাউচর, আষাঢ়িয়ারচর, ইসলামপুর ও পিরোজপুর একাধিক চুনা কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। উপজেলার মোগরাপাড়া ইউনিয়নের সোনাখালী, দমদমা, বন্দেরা ও ইছুফগঞ্জ এলাকায়ও এ ধরনের কারখানা গড়ে উঠেছে।

অভিযোগ উঠেছে, তিতাস কর্তৃপক্ষের কিছু কতিপয় ব্যক্তি এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।

এমন কাণ্ডকে স্থানীয়রা বলেছেন, ‘গ্যাস জ্বলে তিতাসের, টাকা পায় বিএনপি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শ্রমিক জানান, প্রতি সপ্তাহে একবার চুনা নামানো হয়। মাঝামাঝি সময়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়। ফলে তাদের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। তা ছাড়া অভিযানের পূর্বে তারা জানতে পেরে পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। কিছু অসাধু কর্মচারী তাদের কাছ থেকে মাসোহারা নিয়ে থাকে বলেও দাবি করেন তিনি।

বেশ কয়েকজন গ্রামবাসী জানান, চুনা ও ঢালাই কারখানা গুলো ২৪ ঘণ্টা সচল থাকায় বাসা বাড়িতে গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে। তা ছাড়া কারখানার গ্যাসের উত্তাপ পাশের বসতবাড়ি গুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে করে তাদেরকে আতঙ্কে থাকতে হয়।

তবে, অবৈধ চুনা ও ঢালাই কারখানা পরিচালনার সঙ্গে বিএনপি নেতাদের জড়িত থাকার বিষয়টি মিথ্যা ও অপপ্রচার বলে দাবি করেছেন পিরোজপুর ইউনিয়নের পিরোজপুর গ্রামের বিএনপি নেতা শফিউল আলম বাচ্চু।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সোনারগাঁও উপজেলা শাখার সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির বলেন, এমনিতেই গ্যাস সংকটে শিল্প কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার পথে। তারমধ্যে অবাধে গড়ে উঠা অবৈধ চুনা ও ঢালাই কারখানায় যেভাবে গ্যাস ব্যবহৃত হচ্ছে, দেশে খুব দ্রুত গ্যাস সংকট দেখা দেবে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ কামনা করেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর উপসহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ্ আল আরেফীন বলেন, আবাসিক এলাকায় এ ধরনের কারখানা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে ফায়ার লাইসেন্স প্রদান করি না।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের সোনারগাঁও অঞ্চলের ডিজিএম মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন জানান, আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে কারখানা গুলো ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়াসহ মামলা করেও রোধ করতে পারছি না। আমাদের ২৪ ঘণ্টা মনিটর করা সম্ভব না।

বিএনপি নেতাদের সংশ্লিষ্টতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান জানান, বিএনপির নেতাকর্মীদের অবৈধ চুনা কারখানার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছি। তা ছাড়া তিতাস কর্তৃপক্ষকে অবৈধ চুনা কারখানা উচ্ছেদে তৎপর থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র: সময়ের আলো